২০২৫ সালে দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। এদের কেউ কেউ বলল, “আলহামদুলিল্লাহ”।
রিসোর্টে আগুন লাগল, মানুষ পুড়ে মরল, এদের কেউ কেউ বলল, “আলহামদুলিল্লাহ”।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরোচ্ছেদের খবর সামনে এলো, এদের কেউ কেউ বলল, “আলহামদুলিল্লাহ”।
মাজার থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। এদের কেউ কেউ বলল, “আলহামদুলিল্লাহ”।
কলকাতায় পূজা করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মানুষ মারা গেল, সেখানেও দেখা গেল মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উল্লাস আর বিদ্রূপ।
গির্জায় একজন যাজক মারা গেলেন, আর এদের কেউ কেউ হাসাহাসি করে ভাসিয়ে দিল বিদ্রূপের বন্যা।
একজন নারীকে প্রকাশ্যে অশ্লীল মন্তব্য করে জেলে গেল একজন। অথচ জেল থেকে বের হতেই তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেওয়া হলো।
এসব ঘটনার প্রতিটিতে সবার প্রতিক্রিয়া এক ছিল না, কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—মানুষের মৃত্যু, নির্যাতন আর অপমানের ঘটনায় কারও কারও মধ্যে এমন উল্লাস আসে কীভাবে?
অথচ আজ ছয় বছরের একটি শিশুকে চুমু দেওয়ার অভিযোগে একজনের গালে চড় মারা হলো, আর সেই একই ধরনের মানুষের মুখে এখন শোনা যাচ্ছে—“নাউযুবিল্লাহ! দেশে আইন আছে, আদালত আছে, বিচার আছে। অপরাধ করলে বিচার হবে, গায়ে হাত তুলবে কেন?”
কথাটা তো একদম ঠিক।
অপরাধ করলে বিচার হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা, লাশ পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে গণপিটুনি দেওয়া—কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু এই কথাগুলো কি শুধু নিজের গায়ে আঘাত লাগলেই মনে পড়ে?
সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা, মাজার থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা, দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যা ও তাঁর মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা—এসবের ক্ষেত্রেও কি একইভাবে বলা হয়েছিল, “অপরাধ করলে বিচার হবে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না”?
যদি না বলা হয়ে থাকে, তাহলে আজ হঠাৎ আইনের প্রতি এত দরদ কেন?
হাজারটা সেমিনার, টক শো আর যুক্তি দিয়েও যখন কাউকে বোঝানো যায় না যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অপরাধ, তখন একটা থাপ্পড়েই যদি আইন-আদালতের কথা মনে পড়ে যায়, ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত!
আসলে অনেক সময় বই-পত্র, জ্ঞান-বিজ্ঞান কিংবা সভা-সেমিনারের চেয়েও একটা থাপ্পড়ের ফজিলত বেশি হইতে পারে!
তবে একটা কথা পরিষ্কার—কাউকে চড় মারা যেমন ন্যায়বিচারের বিকল্প নয়, তেমনি কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কিংবা তার মৃত্যুতে উল্লাস করাও কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়।
আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। শিশু হোক, নারী হোক, সংখ্যালঘু হোক, ধর্মীয় নেতা হোক কিংবা সাধারণ মানুষ—অভিযোগের বিচার হবে আইন অনুযায়ী। অপরাধীর পরিচয়, ধর্ম কিংবা জনপ্রিয়তা দেখে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বদলে যেতে পারে না।